ক্যান্সারের চিকিৎসায় নির্ভুল ওষুধ পৌঁছে দিতে ন্যানোমেডিসিনে ড. মফিজুরের গবেষণা - News & Updates
← Back to News & Updates

ক্যান্সারের চিকিৎসায় নির্ভুল ওষুধ পৌঁছে দিতে ন্যানোমেডিসিনে ড. মফিজুরের গবেষণা

ক্যান্সারের চিকিৎসায় নির্ভুল ওষুধ পৌঁছে দিতে ন্যানোমেডিসিনে ড. মফিজুরের গবেষণা

ক্যানসারের চিকিৎসায় ওষুধ আবিষ্কারের পাশাপাশি সেই ওষুধ শরীরের সঠিক কোষে পৌঁছে দেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ। কার্যকর কোনো ওষুধ কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে, যদি তা নির্দিষ্ট রোগাক্রান্ত কোষে পৌঁছাতে না পারে বা সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি এড়ানো সম্ভব না হয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ন্যানোমেডিসিন, বায়োইঞ্জিনিয়ারিং ও ইমিউনোথেরাপির সমন্বয়ে কাজ করছেন গবেষক ড. মফিজুর রহমান।

তার গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো এমন ড্রাগ-ডেলিভারি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা রোগাক্রান্ত কোষ শনাক্ত করতে পারবে, শরীরের জৈবিক বাধা অতিক্রম করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে ওষুধ নিয়ন্ত্রিতভাবে মুক্ত করবে। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগের অবস্থাও শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ড. মফিজুর রহমানের গবেষণার মধ্যে রয়েছে লক্ষ্যভিত্তিক ক্যানসার ইমিউনোথেরাপি, প্রকৌশলকৃত এক্সোসোম, ন্যানোবডি-সজ্জিত লাইপোসোম, responsive polymer এবং molecular diagnostic system।

ক্যানসারের জন্য বুদ্ধিমান ন্যানোমেডিসিন

তার গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো nanobody-functionalized drug delivery। ন্যানোবডি হলো অ্যান্টিবডি থেকে উদ্ভূত ছোট আকারের টার্গেটিং মলিকিউল, যা নির্দিষ্ট জৈবিক লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারে। ন্যানোস্কেল ড্রাগ ক্যারিয়ারের সঙ্গে এসব মলিকিউল যুক্ত করে রোগাক্রান্ত টিস্যুতে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করা যায়।

একটি গবেষণায় ড. রহমান ও তার সহকর্মীরা pH-সংবেদনশীল nanobody-polymer platform তৈরি করেন। ক্যানসার কোষের আশপাশের পরিবেশ সাধারণ টিস্যুর তুলনায় বেশি অম্লীয় হওয়ায় এই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়।

গবেষণাটি শুধু ওষুধ সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। টিউমারের অম্লীয় পরিবেশে সাড়া দিয়ে therapeutic component মুক্ত করার পাশাপাশি lactate oxidation-এর মাধ্যমে hydrogen peroxide উৎপাদন এবং urine-এ শনাক্ত করা যায় এমন peptide nucleic acid reporter মুক্ত করার ব্যবস্থাও এতে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ, একই প্ল্যাটফর্মে চিকিৎসা এবং রোগ পর্যবেক্ষণের দুটি সম্ভাবনাকে একত্র করার চেষ্টা করা হয়েছে।

লাইপোসোমে নতুন কৌশল

লক্ষ্যভিত্তিক লাইপোসোমাল ড্রাগ ডেলিভারির ক্ষেত্রেও ড. রহমানের গবেষণা রয়েছে। লাইপোসোম এমন এক ধরনের ন্যানোস্কেল ক্যারিয়ার, যা ওষুধকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি শরীরে এর বণ্টন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। লাইপোসোমের সঙ্গে অ্যান্টিবডি বা অন্য টার্গেটিং মলিকিউল যুক্ত করলে নির্দিষ্ট কোষে ওষুধ পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়ে। তবে প্রচলিত রাসায়নিক পদ্ধতিতে এ ধরনের সংযোজন করতে গেলে প্রক্রিয়া জটিল হয় এবং টার্গেটিং মলিকিউলের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

২০২৪ সালে Nature Nanotechnology-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ড. মফিজুর রহমান ও তার সহকর্মীরা রাসায়নিক পরিবর্তন ছাড়াই nanobody-কে লাইপোসোমের সঙ্গে যুক্ত করার একটি কৌশল উপস্থাপন করেন। বিশেষভাবে নকশা করা chimeric nanobody লাইপোসোমের মেমব্রেনে নিজে থেকেই যুক্ত হতে পারে।

গবেষকদের মতে, এ পদ্ধতিতে nanobody-সজ্জিত immunoliposome তৈরির প্রক্রিয়া সহজ করার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রচলিত পদ্ধতিতে দেখা দেওয়া payload ক্ষয় এবং targeting molecule-এর কার্যকারিতা কমে যাওয়ার সমস্যাও মোকাবিলা করা যায়।

এক্সোসোম দিয়ে কোষের ভেতরে ওষুধ পৌঁছানোর চেষ্টা

ড. রহমানের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো engineered extracellular vesicle বা এক্সোসোম। কোষ থেকে উৎপন্ন এসব ক্ষুদ্র ভেসিকলের কিছু স্বাভাবিক জৈবিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এগুলোকে drug delivery-এর সম্ভাবনাময় বাহক করে তুলেছে। তবে এক্সোসোমভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় কয়েকটি সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোষের cytosol-এ পর্যাপ্ত পরিমাণে therapeutic cargo পৌঁছাতে না পারা, নির্দিষ্ট কোষকে লক্ষ্য করার সীমাবদ্ধতা, উৎপাদনে পরিবর্তনশীলতা এবং কম yield।

২০২৩ সালে Nature Communications-এ প্রকাশিত গবেষণায় ড. রহমান ও তার সহকর্মীরা এমন engineered cell-derived nanovesicle তৈরি করেন, যাতে targeting functionality-এর পাশাপাশি fusogenic component যুক্ত করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল therapeutic cargo-কে আরও কার্যকরভাবে কোষের cytosol-এ পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে এমন চিকিৎসা উপাদানের ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, যেগুলো কোষের নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ অংশে পৌঁছাতে না পারলে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না।

ন্যানোমেডিসিনের পেছনে Materials Science

ন্যানোমেডিসিনে ড. রহমানের বর্তমান কাজের ভিত্তি তৈরি হয়েছে তার materials science-সংক্রান্ত আগের গবেষণা থেকে। পেপটাইড, পলিমার ও লিপিড কীভাবে নিজে থেকেই সংগঠিত হয়ে ন্যানোস্কেল কাঠামো তৈরি করে, তা নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন।

পেপটাইড-লিপিড hybrid vesicle নিয়ে তার গবেষণায় temperature-sensitive একটি ‘lipidic gate’ নিয়ে কাজ করা হয়। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌঁছালে এই gate মেমব্রেন থেকে অণু মুক্ত করতে পারে। এর মাধ্যমে ন্যানোস্কেল মেমব্রেনের গঠন নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে নির্দিষ্ট সময়ে drug release করা যায়, তার একটি সম্ভাব্য কৌশল দেখানো হয়েছে।

এ ছাড়া amphiphilic polypeptide-এর self-assembly ব্যবহার করে tubular nanostructure ও network তৈরির প্রক্রিয়াও তার গবেষণায় এসেছে। polyethylene glycol ও polysarcosine chain-এর পার্থক্য কীভাবে hydrophilicity, flexibility, fusion এবং structural organization-কে প্রভাবিত করে, তা নিয়েও গবেষণা করা হয়েছে।

ইনজেকশনের বিকল্প পথ খোঁজা

ওষুধ শরীরে প্রবেশ করানোর ক্ষেত্রে প্রচলিত ইনজেকশনের বাইরেও বিভিন্ন পথ নিয়ে কাজ করেছেন ড. মফিজুর রহমান।

Transdermal drug delivery: edge activator-যুক্ত nanobody-functionalized liposome ব্যবহার করে ত্বকের মধ্য দিয়ে ওষুধ প্রবেশের সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হয়েছে। Imaging experiment-এ দেখা গেছে, ন্যানোপার্টিকেলগুলো প্রধানত hair follicle-সংশ্লিষ্ট পথ ব্যবহার করে ত্বকের ভেতরে প্রবেশ করেছে।

Oral insulin delivery: পরিপাকতন্ত্রের ভেতরে insulin-কে সুরক্ষিত রাখা এবং intestinal lymphatic pathway-এর মাধ্যমে এর পরিবহন বাড়ানোর লক্ষ্যেও গবেষণা হয়েছে। এতে liver-এর first-pass exposure কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

দ্রুত রোগ শনাক্তকরণেও ন্যানোটেকনোলজি

ড. মফিজুর রহমানের গবেষণা শুধু চিকিৎসা প্রয়োগে সীমাবদ্ধ নয়; molecular diagnostics নিয়েও তার কাজ রয়েছে। CRISPR-ভিত্তিক mutation analysis-এর একটি গবেষণায় Cas12a-loaded liposomal platform তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে প্রচলিত PCR বা sequencing-এর ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করেই DNA mutation শনাক্ত করার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে।

গবেষণাটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল, যাতে biomedical laboratory-তে ব্যবহৃত microplate reader দিয়ে প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে mutation analysis করা যায়। এতে ন্যানোস্কেল প্রযুক্তি কীভাবে রোগ শনাক্তকরণকে দ্রুত ও সহজ করতে পারে, তার একটি সম্ভাব্য দিক উঠে এসেছে।

লিউকেমিয়ার চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপি

সাম্প্রতিক গবেষণায় ড. মফিজুর রহমানের কাজ আরও বেশি লক্ষ্যভিত্তিক cancer immunotherapy-এর দিকে এগিয়েছে। বিশেষ করে leukemia-তে immune signaling সক্রিয় করার পাশাপাশি শরীরজুড়ে এর সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানোর লক্ষ্যে delivery platform তৈরির দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ক্যানসার ইমিউনোথেরাপির একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো— রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করা ওষুধ টিউমারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারলেও শরীরের অন্যান্য অংশে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। লক্ষ্যভিত্তিক carrier ব্যবহার করে immune activity-কে ক্যানসার কোষের দিকে বেশি কেন্দ্রীভূত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

একই লক্ষ্য, ভিন্ন প্রযুক্তি

ড. মফিজুর রহমানের গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্র—engineered exosome, nanobody-targeted liposome, responsive polymer, peptide-lipid assembly, molecular diagnostic এবং cancer immunotherapy—আলাদা হলেও এর পেছনে একটি অভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে:

কীভাবে একটি therapeutic molecule-কে শরীরের জটিল জৈবিক পরিবেশের বাধা অতিক্রম করিয়ে সঠিক কোষ বা টিস্যুতে পৌঁছে দেওয়া যায়?

তার গবেষণায় ক্যানসারের পাশাপাশি প্রদাহজনিত রোগ, metabolic disorder ও degenerative disease নিয়েও কাজের পরিধি রয়েছে। Therapeutic targeting, controlled release, intracellular delivery এবং minimally invasive administration উন্নত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

mRNA, gene-editing tool, protein এবং immune modulator-এর মতো নতুন ধরনের চিকিৎসা দ্রুত বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব উপাদানকে সঠিক কোষে পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তির গুরুত্বও বাড়ছে। ড. রহমানের গবেষণা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় bioengineering ও nanotechnology-কে কাজে লাগানোর একটি প্রচেষ্টা।

শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যটি একই—শুধু শক্তিশালী কোনো ওষুধ তৈরি করা নয়, বরং সেই ওষুধকে শরীরের সঠিক জায়গায়, সঠিক সময়ে এবং যতটা সম্ভব কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পৌঁছে দেওয়া।

ড. মফিজুর রহমান

ড. মফিজুর রহমান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি ডিসিপ্লিন থেকে বি.এস. ও এম.এস. ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি জাপানের RIKEN ও Saitama University-এ ন্যানোমেডিসিন বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত Icahn School of Medicine at Mount Sinai-এর Department of Immunology & Immunotherapy-এ Postdoctoral Fellow হিসেবে কর্মরত আছেন।

তার গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যানোমেডিসিন, লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ সরবরাহ (Targeted Drug Delivery), বায়োম্যাটেরিয়ালস এবং ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপি। এসব ক্ষেত্রে তার গবেষণার লক্ষ্য হলো আধুনিক ন্যানোপ্রযুক্তি ব্যবহার করে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাকে আরও নির্ভুল, কার্যকর এবং নিরাপদ করে তোলা।

গবেষণার উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা: Nature Communications, 14, 3366 (2023); Nature Nanotechnology, 19, 818–824 (2024).